আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে সে নিয়ে মানুষের উদ্বেগের পরিসীমা ছিল না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল। অতীতে কোনোদিন বাংলাদেশের মানুষ এই ধরনের ভোটারবিহীন নির্বাচন দেখেনি। দেশে-বিদেশে সেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা করে, সরকারকে বাধ্য হয়েই নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করতে হচ্ছে এবং তারা খুব শিগগিরই আর একটি নির্বাচন করবে। আদালতে উত্থাপিত একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতেও সরকার পক্ষ থেকে অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার তার কথা রাখেনি। সরকার তার পুরো টার্ম পার করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
আওয়ামী সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে বিরোধী মহলের সংলাপের আহ্বান আগাগোড়া প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু শেষের দিকে এসে হঠাৎ করেই সংলাপে বসতে রাজি হয়ে যায় আওয়ামী লীগ। প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের একটি চিঠির জবাবে শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপে বসতে রাজি হয়ে যান। বাংলাদেশে নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো বিদেশির মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি সংলাপ এবারই প্রথম। শুধু তাই নয়, এর পর জাতীয় পার্টি, বিকল্পধারা, সিপিবি ও গণতান্ত্রিক বামজোটসহ সব দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়ে যায়।
সংলাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে যে সংঘাতমুখী পরিস্থিতি ছিল সেখানে শান্তির সুবাতাস অনুভব করা গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, অতীতে সংলাপ না করে আওয়ামী লীগ কত বড় ভুল করেছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরনো ও অভিজ্ঞ দল যারা দেশের দুশমন আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সঙ্গে পর্যন্ত সংলাপ করেছে, সামরিক শাসক এরশাদের সঙ্গে সংলাপ করেছে, তারা কীভাবে সংলাপ প্রত্যাখ্যানের একগুঁয়েমি দেখাল তা বোঝা দুষ্কর। তবে ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, এত দ্রুত সংলাপ শুরু এবং শেষ শুধু আমাদের চমক সৃষ্টিকারী রাজনীতিক শেখ হাসিনার বদৌলতে হয়নি, এর পেছনে বিদেশি প্রভাবশালী মহলেরও কিছুটা হাত ছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে ডান-বাম সব দল ও জোটের দাবিগুলো প্রায় একই রকম ছিল। ২০১৪ সাল থেকে তারা এসব দাবি নিয়ে সোচ্চার ছিল। অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টি দুই যুগেরও আগ থেকে নির্বাচনকে অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত করে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দাবি নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সে দাবি গণতান্ত্রিক দলগুলোও আমলে নেয়নি। কেননা ওইসব পদক্ষেপ ধনতন্ত্রের ভিত্তিমূলেই আঘাত হানবে এবং ব্রাত্যজনের ক্ষমতায়নকে অনেকটাই অগ্রসর করে নেবে।
এটা আশার কথা যে, সংলাপ সুষ্ঠুভাবেই হয়েছে। সব পক্ষই খোলাখুলি তাদের দাবি ও যুক্তিগুলো তুলে ধরেছে। আমাদের রাজনীতিতে যে গালাগাল এবং লাঠালাঠির দৌরাত্ম্য চলছে তাতে শান্তিপূর্ণ আলোচনার ব্যাপারে অনেকের মনে সংশয় থাকা অস্বাভাবিক নয়। সংলাপ কি সফল হয়েছে! বিরোধী দলের বেশিরভাগ দাবি মানা হয়নি। তবে সংলাপ একেবারে ব্যর্থ হয়েছে এমনটি না বলাই ভালো। সংলাপ নিজেই একটা সাফল্য। সামগ্রিক পরিবেশ অনেকটা শান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুসারে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বাধা সৃষ্টি কিছুটা বন্ধ হয়েছে বলা যায়। এর পর ধরপাকড়, গায়েবি মামলাও কিছুটা কমেছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। সর্বোপরি সব দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধী দলের কাছে অন্য কোনো অপশন ছিল না। পরিস্থিতির সব দিক বিবেচনায় নিয়ে বিরোধী দলগুলো সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছে বলেই মনে হয়। সব দলেই মনোনয়নের ভিড় দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মনোনয়ন ব্যবসাও চলছে দেদার। নির্বাচনী মাঠ ও বাজার জমজমাট।
এই নির্বাচনী জোয়ারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্য কয়েকজনের বক্তব্য অনেককে শঙ্কাগ্রস্ত করতে পারে। শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচনে হারলে কারো পিঠের চামড়া থাকবে না। তোফায়েল আহমেদ এবং ওবায়দুল কাদেরও একই ধরনের কথা বলেছেন। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। নানা ঘটনায় মেঘ দেখে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনই না বাতিল হয়ে যায়। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ না হলেও বয়কট নয়। বামজোট আবারও নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সারাদেশে নির্বাচনের জোয়ার যেভাবে সৃষ্টি হয়েছে, যেভাবে নানা দল ও জোটের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেভাবে হেভিওয়েট প্রার্থীরা আটঘাট বেঁধে নামছে তাতে করে সরকারি দলের তেলেসমাতি দেখানো সহজ হবে না। ভোটারদের জনমত, আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান, সরকারি দলের মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ বিদ্রোহীদের ভূমিকা সরকারের ভোট কারচুপি রুখে দিতে অনেকটাই সফলকাম হবে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত ভোটারদের আস্থা অনেকটা ফিরিয়ে এনেছে। এ অবস্থায় ২০১৪ সালের মতো মন্দ অবশ্যই নয়, ’৭০-এর নির্বাচনের মতো ভালোও নয়, এর মাঝামাঝি কিছু একটা হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্ব