কেউ সংসারের সঞ্চয়, কেউ এনজিও ঋণ, আবার কেউ ধারদেনা করে গরু কিনে বড় স্বপ্ন বুনছেন। তাদের আশা, ঈদে গরুর ভালো দাম পেলে বদলে যাবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা।
উপজেলার মাওনা, তেলিহাটি, বরমী, কাওরাইদ ও গাজীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট খামারে চলছে গরুর নিবিড় পরিচর্যা। কোথাও তিনটি, কোথাও পাঁচটি, আবার কোথাও ১০ থেকে ১২টি গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে কোরবানির বাজার ধরার আশায়। অনেক খামারিই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজ উদ্যোগে খামার পরিচালনা করছেন।
বরমী ইউনিয়নের সোনাকর গ্রামের প্রান্তিক খামারি শামীম মোড়ল বলেন, দুই বছর ধরে লোকসান গেছে। তারপরও আশা ছাড়িনি। এবার গরু মোটাতাজা করছি। ভালো দাম পেলে আগের ক্ষতি পুষিয়ে কিছুটা লাভ করতে পারবো।
শ্রীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের খামারি মাহাদী হাসান পাবেল বলেন, গরুর খাবারের দাম অনেক বেড়েছে। ভুসি, খৈল, খড়,সবকিছুর দাম বেশি। তারপরও দেশীয় গরুর চাহিদা বাড়ছে শুনে সাহস পেয়েছি। আমার খামারে কোরবানির জন্য ২০টি দেশীয় জাতের গরু প্রস্তুত করেছি। এক লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকার মধ্যেও গরু রয়েছে। আশা করছি এবার লাভ হবে।
মাওনা গ্রামের খামারি আবু বক্কর জানান, এক বছর আগে শাহীওয়াল জাতের একটি গরু কিনে পালন শুরু করেন তিনি। কিন্তু পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। তিনি বলেন, ঈদে যদি ভালো দাম পাই, তাহলে আবার নতুন করে শুরু করবো।
হেরাপটকা এলাকার নারী খামারি সেলিনা বেগম বলেন, স্বামী-স্ত্রী মিলে তিনটি গরু পালন করছি। এনজিও থেকে ঋণ এনে গরু কিনেছি। ঈদে ভালো দাম পেলে ঋণ শোধ করে খামার আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।
স্থানীয় পশুর হাটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশীয় খামারে গরু পালনের প্রবণতা বেড়েছে। ভারতীয় গরুর প্রবেশ কম হলে স্থানীয় খামারিরা বেশি লাভবান হবেন বলেও মনে করছেন তারা। তবে খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন বলে মত তাদের।
গরু ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, ছোট খামারিরাই এখন বাজারের বড় ভরসা। গ্রামের সাধারণ মানুষ কয়েকটি গরু পালন করে ঈদের বাজারে বিক্রি করেন। তাদের গরুর চাহিদাও ভালো থাকে।
উপজেলার বিভিন্ন খামারে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ খামারি এখন স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গরু মোটাতাজা করার দিকে ঝুঁকছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা ওষুধ ব্যবহার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছেন তারা। নিয়মিত টিকা প্রদান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে খামারিদের ব্যস্ততা। কেউ গোয়ালঘর পরিষ্কার করছেন, কেউ পশুর খাবার মজুত করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গরুর ছবি প্রকাশ করে আগাম ক্রেতা খুঁজছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছোট খামারিদের অবদান দিন দিন বাড়ছে। নিরাপদ কোরবানির পশুর জোগান নিশ্চিত করতে এবং এই খাতকে টেকসই করতে প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পশুখাদ্যে সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির ঈদ উপলক্ষে শ্রীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজার ৮৯৮টি খামারে মোট ২১ হাজার ৫০৬টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা রয়েছে ১৭ হাজার ৫২৬টি পশুর। চাহিদা পূরণ করে জেলার বাইরেও প্রায় তিন হাজার ৯৮০টি পশু সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফ হোসেন বলেন, খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। আশা করছি এবার খামারিরা ভালো দাম পাবেন।