গাজীপুর সংবাদদাতা : গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ব্যক্তিগত টর্চার সেলে আটকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর জেলা শ্রমিকদলের এক নেতার বিরুদ্ধে।
নির্যাতনের সময় গরম লোহার রড দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া, লাঠিপেটা এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগও করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ব্যবসায়ী বর্তমানে পুলিশ প্রহরায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় আহত ব্যবসায়ী সজীব মিয়ার (৩০) মা মোছা. খালেদা আক্তার (৫০) শুক্রবার (২৪ জুলাই) শ্রীপুর মডেল থানায় গাজীপুর জেলা শ্রমিকদলের সদস্য শরীফ সরকারসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন।
অভিযুক্ত শরীফ সরকার (৪৩) উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের মাওনা গ্রামের মৃত আবুল হোসেন সরকারের ছেলে। আর ভুক্তভোগী সজীব মিয়া উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি দেওচালা গ্রামের মো. কফিল উদ্দিনের ছেলে। তিনি মুলাইদ এমসি বাজারে ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিক্স ব্যবসা পরিচালনা করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শরীফ সরকার সহযোগীদের নিয়ে সজীবের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সজীব চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক একটি প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরে শরীফ সরকারের বাড়ির নিচতলায় থাকা কথিত একটি টর্চার সেলে সজীবকে আটকে রাখা হয়। সেখানে রাতভর তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। গ্যাসের চুলায় গরম করা লোহার রড দিয়ে তার দুই পা ও হাতে একাধিকবার ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। এছাড়া লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আঘাত করলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে আওয়ামী লীগের নেতা ও একটি হত্যা মামলার আসামি পরিচয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাকে আদালতে নেওয়া হলে শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে আদালত তাকে গ্রহণ না করে চিকিৎসার নির্দেশ দেন। এরপর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ হেফাজতে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহতের মা খালেদা আক্তার বলেন, আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শরীফ সরকার। তিনি বলেন, সজীব বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি। বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। মারধরের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আমরা তাকে মারিনি। পরে পুলিশ কী করেছে, তা আমার জানা নেই।
শ্রীপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাজাহারুল ইসলাম বলেন, সজীবকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে নেওয়া হয়েছিল। তবে বিচারক তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আদালতে গ্রহণ না করে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসার নির্দেশ দেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শ্রীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, সজীবকে গুরুতরভাবে মারধর করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন এবং বিষয়টি আদালতের জ্ঞাত রয়েছে। তিনি একটি বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি এটি সত্য। কিন্তু সে কারণে তাকে মারধর করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
তিনি আরও জানান, মারধরের ঘটনায় আহত সজীবের মা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা শ্রমিকদলের সদস্যসচিব আবুল কালাম প্রধান বলেন, শরীফ সরকারের বিরুদ্ধে আগে থেকেও বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় দল নেবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।