গাজীপুরের কালীগঞ্জে জাহিদ মুন্সি (২৬) নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে এক তরুণীকে একাধিকবার ধর্ষণ এবং ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বজন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপরে কালীগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন।
অভিযুক্ত জাহিদ মুন্সি কালীগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ৪ ওয়ার্ডের মুনশুরপুর গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব।
অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসার পর জাহিদ মুন্সিকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে এনসিপি গাজীপুর জেলা শাখা। একই সঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত আত্মপক্ষ সমর্থন ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ জমা দিতে বলা হয়েছে।
বহিষ্কার এবং কারণদর্শানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক এম এম শোয়াইব।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী বর্তমানে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। প্রায় তিন-চার মাস আগে তার বোন কালীগঞ্জের একটি শপিং কমপ্লেক্সে জাহিদ মুন্সির দোকানে ঘড়ি কিনতে গেলে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়।
পরিচয় ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। একপর্যায়ে জাহিদ মুন্সির সঙ্গে ওই তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, সম্পর্কের একপর্যায়ে বিয়ের কথা বলে ওই তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন জাহিদ। এতে তিনি রাজি না হলে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তার মুখমণ্ডল বিভিন্ন অশ্লীল ছবিতে সংযুক্ত করে ভয় দেখানোর অভিযোগ ওঠে।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে এসব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তরুণীকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিবারই ওই তরুণী জাহিদকে বিয়ের জন্য অনুরোধ করতেন। কিন্তু জাহিদ বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাটি ঘটে গত ১০ সেপ্টেম্বর।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে কলেজে যাওয়ার পর জাহিদ তাকে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল মিরের বাজার এলাকার একটি গেস্ট হাউসে নিয়ে যান। সেখানে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
এর কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে তাকে আবার কালীগঞ্জ সরকারি শ্রমিক কলেজের অনার্স ভবনের পেছনে আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশনের পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে তরুণীর পরনের কাপড় খুলে জোরপূর্বক ধর্ষণ এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে ঘটনার ভিডিও ধারণ করার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর ওই তরুণী পুনরায় বিয়ের জন্য চাপ দিলে জাহিদ তাকে হুমকি দেন। তার কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
বিষয়টি পরিবারকে জানানোর পর স্বজনরা জাহিদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
সেখানে তারা জাহিদের আগে একাধিক বিয়ে করার তথ্য জানতে পারেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্য গোপন রেখে বিভিন্ন কৌশলে তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে।
এদিকে জাহিদ মুন্সি ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
ঘটনার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি দলীয় পর্যায়েও গড়িয়েছে।
এনসিপির গাজীপুর জেলা শাখার পক্ষ থেকে জাহিদ মুন্সির কাছে পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে গুরুতর দলীয় নীতি, আদর্শ ও নৈতিকতা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক এম এম শোয়াইব ও সদস্য সচিব খন্দকার আল আমিনের নির্দেশক্রমে তাকে অবিলম্বে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব সাংগঠনিক দায়িত্ব ও পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন এনসিপি গাজীপুর জেলা শাখার জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক (দপ্তর) রফিকুল ইসলাম রায়হান।
গাজীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক এম এম শোয়াইব বলেন, এ ব্যাপারে গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কেন চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে লিখিত আত্মপক্ষ সমর্থন, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও ব্যাখ্যা নোটিশ পাওয়ার দুই কার্যদিবসের মধ্যে শৃঙ্খলা কমিটির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
একটি ঘড়ি কেনার সূত্র ধরে তৈরি হওয়া পরিচয় কীভাবে এমন গুরুতর অভিযোগে পৌঁছাল-এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়ভাবে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তরুণীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তের বক্তব্য এবং আইনগত তদন্তের ফলাফল এখনো সামনে আসেনি।
ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতার পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলেও জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা।