নিজস্ব প্রতিবেদক: খাদ্যের অপচয়কে শুধু সামাজিক অসচেতনতা হিসেবে না দেখে জাতীয় সম্পদ অপচয় হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল।
তিনি বলেন, একদিকে দেশের অসংখ্য পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নানাভাবে অপচয় হচ্ছে। এই বৈপরীত্য খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। তাই খাদ্যের অপচয়রোধে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এক বক্তব্যে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল বলেন, উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ অপরিকল্পিত সংরক্ষণ, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন সংকট কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগের কারণে নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে শুধু খাদ্যই নষ্ট হচ্ছে না; খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, শ্রম, সার, জ্বালানি, পরিবহন ও অর্থেরও অপচয় হচ্ছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর Food Waste Index Report 2024 উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে। ভোক্তার কাছে পৌঁছানো খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি, খাদ্যসেবা ও খুচরা পর্যায়ে নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে গৃহস্থালি পর্যায়ে ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন, খাদ্যসেবা খাতে ২৯ কোটি টন এবং খুচরা পর্যায়ে প্রায় ১২ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য অপচয়ের একটি বড় অংশ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব, পরিবহন সংকট, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ ও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, আবার ভোক্তাকেও অনেক সময় একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়।
খাদ্যের অপচয় কমাতে জাতীয় পর্যায়ে একটি খাদ্য অপচয় ডাটাবেস গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে প্রতিবছর কোন পর্যায়ে কত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে এবং এর কারণ কী—তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, খাদ্য অপচয় পরিমাপের জন্য জাতীয় খাদ্য অপচয় সূচক চালু করা যেতে পারে। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, খুচরা, খাদ্যসেবা ও গৃহস্থালি—প্রতিটি পর্যায়ের ক্ষতি ও অপচয়ের হিসাব রাখা দরকার। পাশাপাশি ২০৩০ সালকে সামনে রেখে নির্ভরযোগ্য ভিত্তিবর্ষের ওপর খাদ্য অপচয় কমানোর পরিমাপযোগ্য জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, বুফে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন আয়োজনে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের কারণে বিপুল খাদ্য নষ্ট হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আতিথেয়তার মর্যাদা খাবারের পরিমাণে নয়, যত্নে।
নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার পুনর্বণ্টনের জন্যও একটি জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে অব্যবহৃত নিরাপদ খাবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার ও নষ্ট খাবারের মধ্যে পার্থক্য কঠোরভাবে বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খাদ্য অপচয়রোধে সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল বলেন, সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, কারাগার ও বড় সরকারি অনুষ্ঠানে খাদ্য প্রস্তুত, ব্যবহার ও অপচয়ের হিসাব রাখা যেতে পারে। এতে জনগণের অর্থে কেনা খাদ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, খাদ্য অপচয়রোধ শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি মানবিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও পরিবেশগত দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে অপচয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। তাই মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে খাদ্য অপচয়বিরোধী জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকের মাঠ থেকে খাদ্য নষ্ট হওয়া কমাতে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্যাকেজিং, দ্রুত পরিবহন ও বাজারসংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষককে শুধু উৎপাদনের দায়িত্ব দিলেই হবে না; উৎপাদিত পণ্য নিরাপদে বাজারে পৌঁছানো ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও খাদ্যনিরাপত্তার অংশ।
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল বলেন, খাদ্য শুধু ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে কৃষকের শ্রম, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি, পরিবহন ও মানুষের অর্থ জড়িত। তাই উৎপাদনের হিসাবের পাশাপাশি কত খাদ্য রক্ষা করা গেল এবং কত মানুষের কাছে পৌঁছানো গেল—সেই হিসাবও জাতীয় খাদ্যনীতির অংশ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ক্ষুধার বাস্তবতা যেখানে এখনো বিদ্যমান, সেখানে খাদ্যের অপচয়কে স্বাভাবিক সামাজিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। খাদ্যের প্রতিটি দানা কৃষকের শ্রম, দেশের সম্পদ, মানুষের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তাই খাদ্যের অপচয়রোধে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।