মো. মাইনুল সিকদার, কালিয়াকৈর (গাজীপুর):গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, কৃষিকাজ, চিকিৎসাসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ না থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে মৌচাক, তেলিরচালা ও চন্দ্রা এলাকার হরতকিতলা, আমতলা, মাইওয়ান মোড়সহ শিল্পাঞ্চলে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোর চাহিদাই ১২০ মেগাওয়াটের বেশি। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে সংকটের কারণে বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কালিয়াকৈর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে রেশনিংয়ের মাধ্যমে সংযোগ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকালে কালিয়াকৈর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা হাতপাখা ও ফাইল দিয়ে বাতাস করছেন। তীব্র গরমে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া তানসিম আক্তার মুনমুন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালের জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন, রোগীদের নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষার কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটরও প্রয়োজন অনুযায়ী চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটে মৌচাক ও চন্দ্রা এলাকার বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদনও কমে গেছে। স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও রয়েছে বলে তাঁরা জানান।
বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ ও সেচপাম্প বন্ধ থাকায় আমন চাষিরাও সমস্যায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার ল্যাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় অন্ধকার নেমে আসে। এতে চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। এমনকি নামাজের সময়ও অনেক মসজিদে বিদ্যুৎ না থাকায় মুসল্লিদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের এই লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন কালিয়াকৈরের সাধারণ মানুষ। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করে জনদুর্ভোগ কমানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।