পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে হাসপাতালে নিতে বিলম্ব করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. মাহবুব আলম সুজন (৩২) নামে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত মাহবুব আলম সুজন শ্রীপুর উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের বাউনী গ্রামের দিনমজুর নূরুল ইসলামের ছেলে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে মাহবুবকে মোবাইল ফোনে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে শরবতের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খাওয়ানোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরে বাড়িতে পুলিশ গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে না নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
তবে শরবতের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খাওয়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সুরাইয়া বেগম শিবলী।
নিহতের বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালে প্রতিবেশী সুরাইয়া বেগমের কাছ থেকে তিনি ৩০ হাজার টাকা ধার নেন। এ সময় এক পাতার স্ট্যাম্পে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা লিখে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে লাভ হিসেবে আরও ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, ওই সময় তার ছেলে মাহবুব বিদেশে ছিলেন। পরে কৌশলে তার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কথা বলে মাহবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। একপর্যায়ে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে দালালের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসে।
নূরুল ইসলামের দাবি, পরে গ্রামে সালিস বসলে তাকে জানানো হয়, মাহবুব বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এ বিষয়ে স্ট্যাম্পে লিখিত প্রমাণ রয়েছে বলেও তাকে দেখানো হয়।
তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি তো ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়েছি। তখন মাতব্বররা বলল, আপনার সই আছে। স্ট্যাম্প দেখার পর আমি অবাক হয়ে যাই। এক পাতার ৩০ হাজার টাকার স্ট্যাম্প কীভাবে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার তিন পাতার স্ট্যাম্প হলো? তারপরও সালিসের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ৫৫ হাজার টাকা দিই।
নিহতের স্ত্রী বাবলী আক্তার বলেন, গত ৫ আগস্ট রাত ১০টার দিকে প্রতিবেশী সুরাইয়া বেগম মোবাইল ফোনে তার স্বামীকে ডেকে নেন। তিনি স্বামীর সঙ্গে সেখানে যান।
বাবলীর অভিযোগ, একপর্যায়ে মাহবুব পানি চাইলে সুরাইয়া দুই গ্লাস শরবত এনে দেন। শরবত পান করার পরপরই মাহবুবের বুক জ্বালাপোড়া ও তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এরপর তিনি বমি করতে থাকেন।
বাবলী আক্তার বলেন, বাড়িতে প্রবেশ করতেই পুলিশ এসে আমার স্বামীকে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। তখন তিনি একের পর এক বমি করছিলেন। আমি বারবার বলেছি, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। শেষ পর্যন্ত আমার স্বামীকে বাঁচানো গেল না।
নূরুল ইসলাম বলেন, গত ৫ আগস্ট রাত ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে মাহবুব ও তাকে প্রতারণা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে আটক করে। এ সময় মাহবুবের মাকেও আটক করা হয়। পরে বয়স বিবেচনায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, তখন থেকেই মাহবুব গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং বারবার বমি করছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেয়নি।
নূরুল ইসলামের ভাষ্য, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে থানা বা হাসপাতালে না গিয়ে পুলিশ বাউনী বাজার, শরীফ বাজার, গোসিঙ্গা বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে। এ সময় আমার ছেলে কয়েক দফা বমি করেছে। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে থানার হাজতখানায় নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে রাত আড়াইটার দিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মাহবুবকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ আগস্ট তার মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানায়।
নূরুল ইসলাম বলেন, প্যারোলে মুক্তি পেয়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় ছেলের জানাজা পড়েছি।কয়েকদিন হলো জামিনে বের হয়েছি। আমার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের বিচার চাই।
নিহতের মা মনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, আমার অসুস্থ ছেলেটাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে ওঠায়। কত অনুরোধ করেছি ছেলেটা মারা যাচ্ছে, আগে হাসপাতালে নেন। পুলিশ শুনেনি।
শরবতে বিষ মেশানোর অভিযোগ অস্বীকার
অভিযোগের বিষয়ে সুরাইয়া বেগম শিবলী বলেন, মাহবুব বিদেশে থাকা অবস্থায় বিকাশের মাধ্যমে তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। টাকা ফেরত না দেওয়ায় তিনি মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বলেন, ৫ আগস্ট দিবাগত রাত ২টার দিকে মাহবুবকে হাসপাতালে আনা হয়। তিনি বলেন, কীটনাশকের কারণে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওয়াশ করার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুরে রেফার করা হয়।
শ্রীপুর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এমদাদ হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রতারণা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি মাহবুবসহ তার বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বয়স বিবেচনায় মাহবুবের মাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, রাস্তা ঘুরে সময় নষ্ট করা হয়নি। সিএনজিচালক পথ ভুল করায় একটু সময় বেশি লেগেছে। থানায় আসার অনেক সময় পর মাহবুব অসুস্থ হয়ে বমি করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এএসআই এমদাদ আরও বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, মাহবুব কীটনাশক পান করেছেন এবং তার অবস্থা ভালো নয়। পরে একজন আত্মীয়ের জিম্মায় তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলা হয়।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, গ্রেপ্তারের পর থানায় আনার সময় মাহবুব সুস্থ ছিলেন। পরে অসুস্থ হলে মানবিক কারণে তাকে একজনের জিম্মায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। তাকে কীটনাশক খাওয়ানো হয়েছে—এমন কথা মাহবুব পুলিশকে বলেননি। থানায় অসুস্থ হওয়ার পরপরই তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ময়নাতদন্ত ছাড়াই কীটনাশক পানে মারা যাওয়া একজন আসামির দাফন কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এ বিষয়ে ওসির কাছে জানতে চাইলে তিনি সুস্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
ওসি জানান, মাহবুব আলমের স্ত্রী বাবলী আক্তার থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে শরবতের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খাওয়ানোর অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের দাবি মাহবুবকে গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ফলে যুবকটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের রহস্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।